ধর্ম ও মজহব (সম্প্রদায়)-এর মধ্যে পার্থক্য

 May be an image of text that says "ধর্ম ও মজহব (সম্প্রদায়)- এর মধ্যে পার্থক্য"

 ধর্ম ও মজহব (সম্প্রদায়)-এর মধ্যে পার্থক্য

১. ভিত্তি: ধর্মের ভিত্তি হলো ঈশ্বর, আর মজহবের ভিত্তি হলো মানুষ। ধর্ম সেই জ্ঞানের নাম যা পরমাত্মা সৃষ্টির আদিতে প্রাণিকুলের কল্যাণের জন্য প্রদান করেছিলেন। অন্যদিকে, মজহব হলো মানুষের তৈরি একটি ব্যবস্থা, যা মানুষ সময়ে সময়ে নিজের প্রয়োজন ও স্বার্থসিদ্ধির জন্য গ্রহণ ও বিস্তার করেছে।

২. উৎপত্তি: ধর্ম ঈশ্বরপ্রদত্ত, তাই তা এক ও অদ্বিতীয়; এতে মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান বা ইহুদি—কারো প্রতি কোনো ভেদাভেদ নেই। বিপরীতপক্ষে, মজহব বা মতবাদসমূহ মানুষের তৈরি হওয়ায় তা বহুবিধ এবং নিজ নিজ অনুসারীদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট।

৩. মালিকানা: ধর্ম সকলের সাধারণ অধিকার, কারণ এটি ঈশ্বরের দান। মজহব প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিষয়, যা সর্বজনীন নয়।

৪. স্থায়িত্ব: ধর্ম সনাতন ও নিত্য, তাই এর বিনাশ নেই। কিন্তু মতবাদ বা সম্প্রদায়সমূহ নবীন এবং মানুষের তৈরি, তাই তাদের বিনাশ অনিবার্য।

৫. যৌক্তিকতা: ধর্ম বুদ্ধি, তর্ক ও বিজ্ঞানের উপাসক; ধর্মকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। মজহব বা সম্প্রদায় প্রায়শই বুদ্ধি ও বিজ্ঞানের বিরোধী; এটি মানা বা না মানা মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, বাধ্যতামূলক নয়।

৬. কর্মফল: ধর্ম বিশ্বাস করে যে মানুষ তার কর্মানুসারে ফল পায়—পাপ ও পুণ্য উভয়ের ফলই ভোগ করতে হয়, যার ফলে পৃথিবীতে পাপ বৃদ্ধি পায় না। অন্যদিকে মজহব চলে সুপারিশের (শফায়াত) ওপর। সেখানে কোনো পয়গম্বর, ঈশ্বরপুত্রের  সুপারিশ ছাড়া স্বর্গের দ্বার খোলে না; আবার সুপারিশ পেলে মহাপাপীও স্বর্গে প্রবেশ করতে পারে—এই ধারণাই পৃথিবীতে পাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

৭. সম্পর্ক: ধর্ম ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে; আত্মা ও পরমাত্মার মাঝে কোনো পীর, পয়গম্বর, ঈশ্বরপুত্র অবতারের আবশ্যকতা অনুভব করে না। মজহব ঈশ্বর ও মানুষের মাঝে নিজস্ব 'এজেন্ট' বা মধ্যস্থতাকারীদের দাঁড় করিয়ে দেয়।

৮. দৃষ্টিভঙ্গি: ধর্ম সকল প্রাণীর সুখের জন্য; কিন্তু মজহব কেবল নিজ অনুসারীদের সুখের দায়িত্ব নেয়। মজহবে কেবল 'ঈমান' বা বিশ্বাসই সব; সেখানে অনুসারীরা হলো বিশ্বাসী আর বাকিরা অবিশ্বাসী—এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই মজহবের ভিত্তি।

৯. উদ্দেশ্য: ধর্ম মানুষের পূর্ণ জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং একট ক্রমবিকাশের মাধ্যমে তাকে উন্নত করে। মজহবে এমন কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, এটি মানুষকে পশুর মতো বেঁধে রাখতে শেখায়; সেখানে মুক্ত বুদ্ধির প্রয়োগ নিষিদ্ধ।

১০. প্রকৃতি বিরুদ্ধতা: ধর্মে সৃষ্টি-নিয়মের বিরুদ্ধে কিছু নেই। মজহব সৃষ্টি-নিয়ম বিরোধী অলৌকিক গল্পে ভরা—যেমন মৃতদেহ জীবিত হওয়া, কুমারীর গর্ভে সন্তান জন্ম দেওয়া, মানুষের গর্ভে পশু-পাখিসহ সব জীবন-জন্তুর জন্ম, কারো রথের চাকায় পৃথিবীতে সাত সমুদ্রের জন্ম বা পাথর থেকে ঝরনা বের করা ইত্যাদি।

১১. নারীর অধিকার: ধর্ম নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার দেয়। মজহব নারীকে নরকের দ্বার, শয়তানের রশি বা হীন প্রতিপন্ন করে তাদের অধিকার হরণ করে।

১২. চরিত্র ও বাহ্যিকতা: ধর্মে সত্য, সরলতা, সন্তোষ, স্নেহ ও উচ্চ চরিত্রই প্রধান। মজহব এই গুণগুলোকে উপেক্ষা করে বিশেষ পোশাক বা শারীরিক পরিবর্তন ইত্যাদির মতো স্রেফ বাহ্যিক চিহ্নকেও অধিক গুরুত্ব দেয়।

অতএব, ধর্ম ও মজহবকে এক মনে করা এক বিরাট ভুল এবং এটিই ধর্ম-বিরোধিতার মূল কারণ। মজহব বা সম্প্রদায় হলো মনুষ্যত্বের শত্রু। শান্তিময় বিশ্ব গড়তে হলে মজহবের সংকীর্ণতা ত্যাগ করে ধর্মের উদারতাকে গ্রহণ করতে হবে।

Post a Comment

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম