অদ্বৈতবাদী (অ)ধর্মসম্রাট করপাত্রীর স্থির-নিশ্চল পৃথিবী বিজ্ঞানের যুক্তি

✅ অদ্বৈতবাদী (অ)ধর্মসম্রাট করপাত্রীর স্থির-নিশ্চল পৃথিবী বিজ্ঞানের যুক্তি
 
"যদি পৃথিবীকে গতিশীল মেনে নেওয়া হয়, তবে সকালে নিজের নীড় থেকে বের হওয়া বাজপাখি সন্ধ্যায় নিজের ঘরে আসতে পারবে না, কারণ সন্ধ্যা অব্দি তো পৃথিবী গতিশীল হয়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। বাজপাখি নিজের আবাসে তখনই ফিরে আসতে পারবে যখন কিনা তা স্থির হবে। "
 
- স্বামী করপাত্র মহারাজ (হরিহরানন্দ সরস্বতী)
 
সূত্র: বেদার্থপারিজাতঃ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ১২৯৫
 
No description available. 
No description available. 
 


অথ ভাস্কর মত খণ্ডনম্

(ভাস্করাচার্যের মতের খণ্ডন)

আচার্য ভাস্কর (প্রথম ভাস্কর) তাঁর ‘আর্যভট্টীয়’ ভাষ্যে (৪/৯) ভূ-ভ্রমণ বা পৃথিবীর আবর্তনকে ‘পূর্বপক্ষ’ (আপত্তিজনক মত) হিসেবে গণ্য করে ‘উত্তরপক্ষে’ আর্যভট্টের মূল সূত্রের অর্থ সম্পূর্ণ পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর মতে:

"পৃথিবীর আবর্তন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিরোধী। যদি এমনটা হতো তবে ভূমণ্ডলে প্রলয় উপস্থিত হতো। অতএব আর্যভট্টের এই সূত্রের অন্য কোনো ব্যাখ্যা হওয়া উচিত। অর্থাৎ পৃথিবী আসলে স্থির, কিন্তু নক্ষত্রমণ্ডল আবর্তিত হচ্ছে; তাই নক্ষত্রমণ্ডলের কাছে পৃথিবীকে ঘূর্ণায়মান মনে হয়—কিন্তু বাস্তবে পৃথিবী ঘোরে না।"

ভাস্করাচার্যের এই ব্যাখ্যা স্বয়ং অত্যন্ত হাস্যকর। কারণ আর্যভট্ট তাঁর মূল সূত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন: অচলানি ভানি তদ্বৎ সমপশ্চিমগানি অর্থাৎ:

অচল নক্ষত্রপুঞ্জই পশ্চিম দিকে গতিশীল বলে প্রতীয়মান হয়—ঠিক যেমন প্রবহমান জলে নৌকার আরোহীর কাছে তীরের স্থির বস্তুগুলো বিপরীত দিকে গতিশীল বলে মনে হয়।

যখন মূল সূত্রেই নক্ষত্রসমূহকে ‘অচল’ বলা হয়েছে এবং পৃথিবীকে ‘স্থির’ বলা হয়নি, তখন ভাস্করাচার্য কর্তৃক নক্ষত্ররাজিকে গতিশীল এবং পৃথিবীকে স্থির বলে যে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা একান্তই যুক্তিহীন ও হাস্যকর।

 
 
 

ব্রহ্মগুপ্ত এবং পরমেশ্বর মত খণ্ডনম্

(ব্রহ্মগুপ্ত ও পরমেশ্বরের মতের খণ্ডন)

সপ্তম শতাব্দীর মহান গণিতজ্ঞ আচার্য ব্রহ্মগুপ্ত তাঁর ‘ব্রহ্মস্ফুটসিদ্ধান্ত’ গ্রন্থে (১১/১৭) আর্যভট্টের ভূ-ভ্রমণ (পৃথিবীর আবর্তন) সিদ্ধান্তের খণ্ডন করতে গিয়ে বলেছেন:

প্রাণেনৈতি কলাং ভূর্যদি তর্হি কুতো ব্রজেৎ কমধ্বানম্ । আবর্ত্তনামুর্ব্যাশ্চেন্ন পতন্তি সমুচ্ছ্রয়াঃ কস্মাৎ ॥

অর্থ: যদি পৃথিবী এক ‘অসু’তে (সময়ের একক) এক ‘কলা’ (দূরত্বের একক) পথ অতিক্রম করে, তবে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে কোন পথে যাতায়াত করে? অর্থাৎ, পৃথিবীর পূর্বমুখী আবর্তনের ফলে মানুষ ও পক্ষীকুল নিজ স্থান থেকে অন্যত্র নিক্ষিপ্ত হবে এবং পুনরায় নিজ স্থানে ফিরে আসতে পারবে না। অধিকন্তু, পৃথিবী যদি ওপর-নিচে আবর্তিত হতো, তবে অট্টালিকা ও পর্বতসমূহ কেন ধসে পড়ছে না? অতএব, পৃথিবীর পূর্বমুখী আবর্তন সম্ভব নয়।

আর্যভট্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ব্রহ্মগুপ্তের এই যুক্তিগুলো যে কতটা অপরিপক্ব ও শিশুসুলভ ছিল, তা বর্তমান বিজ্ঞানমনস্ক পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারেন।

তবে একটি বিষয় ব্রহ্মগুপ্তের ভাষ্যকার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেছেন: পরমেশ্বরাচার্য ‘আর্যভট্টীয়’ গ্রন্থের (৪/৯) শ্লোকের যে অপব্যাখ্যা করে পৃথিবীকে ‘স্থির’ হিসেবে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন, তা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, যদি আর্যভট্টের সেই সূত্রের অর্থ পৃথিবীকে স্থির রাখাই হতো, তবে ব্রহ্মগুপ্ত কেন তাঁর খণ্ডন করতে প্রবৃত্ত হতেন? এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীনকাল থেকেই আর্যভট্টের প্রকৃত সিদ্ধান্ত ছিল পৃথিবীর আবর্তন, আর পরবর্তীকালের ভাষ্যকাররা সেই বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

 

 

 

Post a Comment

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম