শঙ্করাচার্য কি স্ত্রী - শূদ্রের বেদাধিকার মানতেন ?


শঙ্করাচার্য কি স্ত্রী - শূদ্রের বেদাধিকার মানতেন ?

উত্তরঃ না মানতেন না । প্রমাণসমূহ নিম্নরূপ -

শূদ্রের বেদাধিকার নেই । শূদ্র বেদ শ্রবণ করলে তার কানে সীসা ঢালতে হবে ও বেদ আয়ত্ত করলে তার শরীর খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেলতে হবে ।

১। ব্রহ্মসূত্র ১।৩।৩৮ ভাষ্যে -

ইতশ্চ ন শূদ্রস্যাধিকারঃ যদস্য স্মৃতেঃ শ্রবণাধ্যযনার্থপ্রতিষেধো ভবতি। বেদশ্রবণপ্রতিষেধঃ বেদাধ্যযনপ্রতিষেধঃ তদর্থজ্ঞানানুষ্ঠানয়োশ্চ প্রতিষেধঃ শূদ্রস্য স্মর্যতে। শ্রবণপ্রতিষেধস্তাবৎ অথ হাস্য বেদমুপশ্রৃণ্বতস্ত্রপুজতুভ্যাং শ্রোত্রপ্রতিপূরণম্ ইতি পদ্যু হ বা এতচ্ছমশানং যচ্ছূদ্রস্তস্মাচ্ছূদ্রসমীপে নাধ্যেতব্যম্ ইতি চ। অত এবাধ্যযনপ্রতিষেধঃ যস্য হি সমীপেঽপি নাধ্যেতব্যং ভবতি স কথমশ্রুতমধীয়ীত। ভবতি চ বেদোচ্চারণে জিহ্বাচ্ছেদঃ ধারণে শরীরভেদ ইতি। অত এব চার্থাদর্থজ্ঞানানুষ্ঠানয়োঃ প্রতিষেধো ভবতি ন শূদ্রায় মতিং দদ্যাৎ ইতি দ্বিজাতীনামধ্যযনমিজ্যা দানম্ ইতি চ। যেষাং পুনঃ পূর্বকৃতসংস্কারবশাদ্বিদুরধর্মব্যাধপ্রভৃতীনাং জ্ঞানোৎপত্তিঃ তেষাং ন শক্যতে ফলপ্রাপ্তিঃ প্রতিষেদ্ধুম্ জ্ঞানস্যৈকান্তিকফলত্বাৎ। শ্রাবয়েচ্চতুরোবর্ণান্ ইতি চেতিহাসপুরাণাধিগমে চাতুর্বর্ণ্যস্যাধিকারস্মরণাৎ। বেদপূর্বকস্তু নাস্ত্যধিকারঃ শূদ্রাণামিতি স্থিতম্॥

অনুবাদঃ আর এইহেতুবশতঃও শূদ্রের [ শ্রৌত ব্রহ্মবিদ্যাতে ] অধিকার নাই, যেহেতু স্মৃতিবাক্যবলে ইহার ‘শ্রবণ, অধ্যয়ন ও অর্থের প্রতিষেধ আছে । [ ইহাই পরিষ্কার করিতেছেন— ] শূদ্রের পক্ষে বেদশ্রবণের প্রতিষেধ, বেদাধ্যয়নের প্রতিষেধ এবং তাহার অর্থজ্ঞান ও তদনুযায়ী অনুষ্ঠানের প্রতিষেধ স্মৃতিশাস্ত্রে বর্ণিত হইতেছে। শ্রবণের প্রতিষেধ এইপ্রকার—“আর সমীপবর্ত্তিস্থান হইতে [ বুদ্ধিপূর্ব্বক ] বেদশ্রবণকারী ইহার (শূদ্রের) কর্ণবিবর ত্রপু (—সীসক) ও জতুর (গালার) দ্বারা পরিপূরণরূপ প্রায়শ্চিত্ত করা কর্ত্তব্য” [ গৌ০ ধ০ ১২।৪ ] এবং “এই যে শূদ্র, ইহা নিশ্চয় চলমান শ্মশান, সেইহেতু শূদ্রের নিকট বেদাধ্যয়ন করিবে না”, [ বশি০ ১৮ ] ইত্যাদি। এইহেতুবশতঃই (– বেদশ্রবণের নিষেধবশতঃ ই ) বেদাধ্যয়নের প্রতিষেধ সিদ্ধ হয়, কারণ যাহার সমীপেও [ বেদ ] অধীত হওয়া উচিত নহে, সে কি প্রকারে [ গুরুর মুখে ] শ্রবণ না করিয়া [ বেদ ] অধ্যয়ন করিবে ? আর বেদোচ্চারণ করিলে [ শূদ্রের ] জিহ্বাচ্ছেদন এবং ধারণ ( অভ্যাসদ্বারা আয়ত্ত, - স্বয়ম্ উচ্চারণ) করিলে শরীরভেদ (-পরশুদ্বারা খণ্ড খণ্ড করিয়া কৰ্ত্তন”), ইত্যাদি স্মৃতিবচন [ গো০ ধ০ ১২।৪ ল] আছে। আর এইহেতুবশতঃই ( — অধ্যয়ন ও অভ্যাস নিষিদ্ধ হওয়ায়) অর্থাপত্তিবলে [ শূদ্রের পক্ষে ] বেদার্থজ্ঞান ও [ তদনুযায়ী ] অনুষ্ঠানের প্রতিষেধ [ সিদ্ধ ] হয়। [ সাক্ষাদ্ভাবেও বেদার্থজ্ঞানের প্রতিষেধ আছে, যথা— ] “শূদ্রকে মতি দান করিবে না” [ মনু০ ৪।৮০ ] এবং “বেদাধ্যয়ন যজ্ঞ ও দান দ্বিজাতিগণের জন্ম বিহিত”, [ গো০ ধ০ ৯।১ ] ইত্যাদি ।[ আর যে বিদুর প্রভৃতির জ্ঞানোৎপত্তির কথা বলা হইয়াছে (১/৩/৩৪ সূঃ ৭ বাক্য), তদুত্তরে বলিতেছেন- ] কিন্তু বিদুর ও ধর্ম্মব্যাধ প্রভৃতি ভাষ্যানুবাদ যাঁহাদের পূর্ব্বজন্মকৃত সংস্কারবলে জ্ঞানোৎপত্তি হয়, তাঁহাদের [ মোক্ষরূপ ] ফল প্রাপ্তির প্রতিষেধ করিতে পারা যায় না, যেহেতু জ্ঞানের ফল অবশ্যম্ভাবী। [ বেদমূলক বিস্তাতে অধিকার না থাকিলেও ইতিহাস ও পুরাণমূলক ( স্মৃতিমূলক) বিজ্ঞাতে শূদ্রের অধিকার।] আচ্ছা, সিদ্ধ শূদ্রের ফলপ্রাপ্তি অবশ্যম্ভাবী হইলেও সাধক শূদ্রের জ্ঞানলাভ কি প্রকারে হইবে? তদুত্তরে বলিতেছেন— ] আর “চারিবর্ণকে শ্রবণ করাইবে” , এইপ্রকারে ইতিহাস ও পুরাণের জ্ঞানলাভে চারিবর্ণেরই অধিকার স্মৃতিতে বর্ণিত হওয়ায়, “সেই সকল হইতেই তাহাদের জ্ঞানোৎপত্তি হইবে”। [ তাহা হইলে শূদ্রের কোন বিষয়ে অধিকার নিবারিত হইতেছে ? তাহা বলিতেছেন-] কিন্তু ? বেদপূৰ্ব্বক [ জ্ঞানোৎপত্তিতে ] শূদ্রগণের অধিকার নাই, ইহা নিশ্চিত হইল ।


উপনিষদের কন্যার পাণ্ডিত্যের কথা থাকলেও শঙ্করাচার্য তা ঘরের কাজের পাণ্ডিত্য বলেছেন কেননা বেদে অধিকার নেই ।

২। বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৬।৪।১৭

দুহিতুঃ পাণ্ডিত্যং গৃহতন্ত্রবিষয়মেব, বেদেঽধিকারাৎ ।

অনুবাদঃ দুহিতার পাণ্ডিত্য কথায় গার্হস্থ্য - শাস্ত্রবিষয়ক বিদ্যাই বুঝিতে হইবে । কারণ , স্ত্রীলোকের বেদে অধিকার নাই৷


শূদ্রের বেদাধিকার নেই এটি তার গীতা ভাষ্যেও স্পষ্টভাবে বলেছেন ।

৩। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮।৪১

ব্রাহ্মণাঃ চ ক্ষত্রিয়াঃ চ বিশঃ চ ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশঃ তেষাং 'ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাং চ ' শূদ্রাণাম্ অসমাসকরণম্ একজাতিত্বে সতি বেদানধিকারাৎ ।

অনুবাদঃ ব্ৰাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় এবং বিশ (বৈশ্য)= ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বিশ, তাদের =ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশদের এবং শূদ্রদের—। এখানে ব্রাহ্মণাদির সহিত শূদ্রদের সমাস করা হয় নি; তার কারণ, তারা একজাতি, হওয়াতে (অর্থাৎ উপনয়নের দ্বারা দ্বিজাতিত্ব প্রাপ্তি না হওয়ায়) বেদে তাদের অনধিকার ।

 



গীতার ব্যাখ্যা বলেছেন - 

স্ত্রী শূদ্র বৈশ্য এদের জন্ম হলো পাপ । তাই এরা পাপযোনী ।

৪। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৯।৩২

মাং হি যস্মাৎ 'পার্থ ব্যপাশ্রিত্য' মাম্ আশ্রয়ত্বেন গৃহীত্বা '। ' যে অপি স্যুঃ' ভবেয়ুঃ পাপযোনয়ঃ পাপা যোনিঃ যেষাং তে পাপযোনয়ঃ পাপজন্মানঃ৷ কে তে ইতি? আহ ' স্ত্রিয়ঃ বৈশ্যাঃ তথা শূদ্রাঃ তেপি যান্তি গচ্ছন্তি 'পরাং গতিং' প্রকৃষ্টাং গতিম্ ।

অনুবাদঃ হে পার্থ ! যারা পাপযোনিও হয়ে থাকে—পাপযোনি অর্থাৎ পাপজন্ম যাদের তারা পাপযোনি অর্থাৎ পাপজন্মা।, —তারা কে? তাই বলেছেন, স্ত্রী, বৈশ্য এবং শূদ্রেরা ; আমাকে আশ্রয়ত্বরূপে গ্রহণ করায় তারাও পরাগতি অর্থাৎ প্রকৃষ্ট গতি প্রাপ্ত হয়।



অলমিতি



Post a Comment

Previous Post Next Post

যোগাযোগ ফর্ম