ভাদ্রপদের শুক্লপক্ষের একাদশীকে ‘পদ্মা’ বলা হয়। ব্রহ্মা নারদকে বললেন— সূর্যবংশে মান্ধাতা নামে এক রাজা হয়েছিলেন, যিনি ধর্মানুযায়ী প্রজাপালন করতেন। অনেক কাল কেটে যাওয়ার পর, তাঁর রাজ্যে টানা তিন বছর বৃষ্টি হয়নি। ফলে প্রজাগণ দুঃখিত হয়ে রাজার কাছে গিয়ে বলল— “মহারাজ, আপনি তো একজন ধর্মনিষ্ঠ রাজা, তবুও কেন বৃষ্টি হচ্ছে না তা বোঝা যাচ্ছে না। অনুগ্রহ করে আপনি এর কোনো উপায় খুঁজুন।”
তখন রাজা গভীর বনে গেলেন। মুনিদের আশ্রমে ঘুরতে ঘুরতে অঙ্গিরা ঋষির নিকট পৌঁছলেন। তাঁকে নমস্কার করে নিজের সব ঘটনা খুলে বললেন। তখন ঋষি বললেন— এই যুগ কৃতযুগ অর্থাৎ সত্যযুগ, যা সমস্ত যুগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এই যুগে মানুষ ব্রহ্মনিষ্ঠ, এবং ধর্ম চতুর্পদে প্রতিষ্ঠিত:
এতৎ কৃতযুগং রাজন্ যুগানামুত্তমং মতম্।
অত্র ব্রহ্মপরা লোকা ধর্মশ্চাত্র চতুষ্পদঃ ॥ ২৯ ॥
এই কারণে, শুধু ব্রাহ্মণরাই তপস্যা করতে পারে, অন্যরা নয়। কিন্তু হে রাজেন্দ্র! তোমার রাজ্যে এক শূদ্র তপস্যা করছে—
অস্মিন্ যুগে তপোযুক্তা ব্রাহ্মণা নেতরেজনাঃ ।
বিষয়ে তব রাজেন্দ্র বৃ্ষলোঽয়ং তপস্যতি ॥ ৩০ ॥
এই কারণেই মেঘ বৃষ্টি করে না। তাকে বধ করো— তবেই এই দোষ দূর হবে—
এতস্মাৎ কারণাচ্চৈব নবর্ষতি বলাহকঃ ।
কুরু তস্য বধে যত্নং যেন দোষঃ প্রশাম্যতি ॥ ৩১ ॥
তখন রাজা বললেন— “এই নিরপরাধ তপস্বীকে আমি বধ করব না। আপনি এমন কোনো ধর্মোপদেশ দিন, যা এই বিপদ দূর করতে পারে”—
নাহমেনং বধিষ্যামি তপস্যন্তমনাগসম্ ।
ধর্মোপদেশং কথয় উপসর্গবিনাশনম্ ॥ ৩২ ॥
তখন ঋষি বললেন— “হে রাজন! যদি তাই হয়, তবে ভাদ্রপদের শুক্লপক্ষের একাদশীতে ‘পদ্মা’ নামে যে ব্রত আছে, তা পালন করো—
যদ্যেবং তর্হি নৃপতে কুরুষ্বৈকাদশ্যীব্রতম্ ।
নভস্যস্যসিতে পক্ষে পদ্মানামেতি বিশ্রুতা ॥ ৩৩ ॥
এই ব্রতের প্রভাবে নিশ্চয়ই বৃষ্টি হবে। এটি সর্বসিদ্ধিদায়িনী এবং সমস্ত বিপদ নাশ করে—
তস্যা ব্রতপ্রভাবেন সুবৃষ্টির্ভবিতা ধ্রুবম্ ।
সর্বসিদ্ধিপ্রদাহ্যেষা সর্বোপদ্রবনাশিনী ॥ ৩৪ ॥
রাজা এই কথা শুনে গৃহে ফিরে এসে সমস্ত প্রজা ও চার বর্ণের মানুষের সঙ্গে এই ব্রত পালন করলেন—
ভাদ্রমাসে সিতে পক্ষে পদ্মাব্রতমথাকরোৎ ।
প্রজাভিঃ সহ সর্বাভিশ্চাতুর্বর্ণ্যসান্বিতঃ ॥ ৩৬ ॥
এর ফলে মেঘ বৃষ্টি দিল, মাটি জলে প্লাবিত হল এবং শস্যে ভরে উঠল—
এবং ব্রতে কৃতে রাজন্ প্রববর্ষ বলাহকঃ ।
জলেন প্লাবিতা ভূমির্ভবৎ সস্যশালিনী ॥ ৩৭ ॥
অতএব, এই উত্তম ব্রত পালন করা উচিত। দানস্বরূপ দই, ভাত, জলভর্তি কলস, ছাতা, জুতো ব্রাহ্মণকে প্রদান করবে, এবং প্রার্থনা করবে— “হে গোবিন্দ! আপনি আমাদের সুখ দান করুন।”
- সূত্র: পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, অধ্যায় ৫৭ [চৌখাম্বার সংস্করণে অধ্যায় ৫৮]
সম্মানিত
পাঠক, ভেবে দেখুন। আপনাকে তথাকথিত শূদ্র বলে বৈদিক শাস্ত্র থেকে দূরে
সরিয়ে রাখা হয়েছে। পুরাণেই লেখা সত্যযুগ যে যুগে নাকি সবই ভালো সেখানে
শূদ্র তপস্যা করলে তার শাস্তি 'মৃত্যুদণ্ড' ! এই কথা বলানো হচ্ছে বেদের
মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি অঙ্গিরাকে দিয়ে। অথচ এই অথর্ববেদেই আছে,
প্রিয়ং মা দর্ভ কৃণু ব্রহ্মরাজন্যাভ্যাং শূদ্রায় চার্যায় চ ।
যস্মৈ চ কাময়ামহে সর্বস্মৈ চ বিপশ্যতে ॥ অথর্ববেদ ১৯।৩২।৮
প্রিয়ং মা কৃণু দেবেষু প্রিয়ং রাজসু মা কৃণু ।
প্রিয়ং সর্বস্য পশ্যত উত শূদ্র উতার্যে ॥ অথর্ববেদ ১৯।৬২।১
তাহলে
যেখানে একজন রাজা নিরীহ সাধককে (পুরাণের ভাষায় শূদ্র তপস্বী) হত্যা করতে
চাচ্ছে না সেখানে এক ঋষি উপদেশ দিচ্ছেন তাকে বধ করতে আর যদি তা না পারে তবে
এই একাদশী করতে ? স্বয়ং বিচার করুন এই কাল্পনিক আচারের ভিত্তিই কতটা
কলুষিত।
Tags
পদ্ম




